ছবির ক্যাপশন:
ব্যাপ্তিকাল সরে যাচ্ছে ১০-১৫ দিন, ফসল উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বদলে যাচ্ছে বর্ষা মৌসুমের সময়। চিরায়ত নিয়মে ঋতু পরিক্রমায় বর্ষা আসে মের শেষ অথবা জুনের সূচনালগ্নে। তবে গত কয়েক বছর ধরে এই নিয়ম মানছে না প্রকৃতি। গত বছরের মতো এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঋতু বর্ষা আসছে একটু দেরিতেই। এক সপ্তাহ আগে গত রবিবার মৌসুমি বায়ু বা বর্ষাবাহী সজল সঘন মেঘমালা বাংলাদেশের আকাশে প্রবেশ করলেও এখনো তা সারা দেশে পুরোপুরি সক্রিয় হয়নি। আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যত বর্ষা আসতে জুনের প্রথম পক্ষ চলে যাবে। আষাঢ় আসবে পরশু মঙ্গলবার। ইতিমধ্যে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূল এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। লঘুচাপের কারণে সঞ্চারণশীল ভারী মেঘমালার সৃষ্টি হয়েছে। তার প্রভাবে বৃষ্টি হচ্ছে কোনো কোনো জেলায়। বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়ার কারণে দেশের চার সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত এবং নদী বন্দরগুলোতে ১ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, সামগ্রিকভাবে বর্ষার সময়কাল অন্তত ১৫ দিন সরে যেতে দেখা যাচ্ছে। অতীতে মে মাসের শেষের দিকে বর্ষা শুরু হতো। আর শেষ হতো সেপ্টেম্বরের শেষে এসে। এখন দেখা যাচ্ছে বর্ষা শুরু হতে জুনের মাঝামাঝি সময় লেগে যাচ্ছে। আর শেষ হতে সময় লেগে যাচ্ছে অক্টোবর পর্যন্ত। আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষার এই খেয়ালিপনা চলছে গত ১৭ বছর ধরে। বর্ষার আগমন-নির্গমন দেরিতেই হচ্ছে। বর্ষার ব্যাপ্তিকাল সরে যাচ্ছে ১০ থেকে ১৫ দিন। এর বিরূপ প্রভাবে আমন, আউশ ও সবজির উৎপাদন প্রভাবিত হচ্ছে। অনেক স্থানে এসব ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান বলেন, গত বছর, তার আগের বছরও বর্ষা আসতে দেরি হয়েছে। এটি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে একটু বেশি সময় নিয়ে বিদায় নিচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান জানান, বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত বৃষ্টির পরিমাণটা কিছুটা বাড়তে পারে। লঘুচাপটি দুই দিন থাকবে তারপর আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু বিস্তার লাভ করেছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে।
আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, যেহেতু মৌসুমি বায়ু সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে এই সপ্তাহে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দমকা হাওয়া বইবে। কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। খুলনা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, রংপুর ও ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে বর্ষাকাল নিয়ে কোনো পূর্বাভাস টিকছে না। গরম আবহাওয়ায় বাড়তি আর্দ্রতা গ্রীষ্ম ও বর্ষাকে করে তুলেছে আরো বেশি বৃষ্টিপ্রবণ, মাঝেমধ্যে হচ্ছে অতি বর্ষণ। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ায় মোটামুটি জুনের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বর্ষাকাল ধরা হয়। এ সময় মৌসুমি বায়ু যে বিপুল বৃষ্টি নিয়ে আসে, তা এ অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বৃষ্টি পৃথিবীর এক পঞ্চমাংশ মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। সময়মতো বৃষ্টি যেমন ফসল উৎপাদন বাড়ায়, তেমনি আবার অসময়ের অতিবর্ষণ ফসল ধ্বংসও করে। অতিবৃষ্টি নিয়ে আসে বন্যা, কেড়ে নেয় প্রাণ, ধ্বংস করে লোকালয়, ছড়িয়ে দেয় দূষণ। নতুন এই গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বর্ষার এই মেজাজ বদলে পুরো অঞ্চলের চেহারা আর ইতিহাসই বদলে যেতে পারে।
এ গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ব্রাউন ইউনিভার্সিটির আর্থ, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক স্টিভেন ক্লেমেন্স। তিনি বলেন, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড বেড়ে যাওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যায়। জার্মানির পোস্টড্যাম ইনস্টিটিউটের ক্লাইমেট ডাইনামিকসের অধ্যাপক অ্যান্ডার্স লিভারম্যান বলছেন, সাম্প্রতিক বর্ষ মৌসুমগুলোতে বৃষ্টির আর ক্ষতির পরিমাণ এমনিতেই বেড়ে গেছে। কিন্তু ভবিষ্যতের যে ঝুঁকি তারা দেখতে পাচ্ছেন, তা হবে বিপর্যয়কর। তাছাড়া ঋতুবৈচিত্র্য যেভাবে পালটে যাচ্ছে, তাতেও প্রাণ ও প্রতিবেশের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
