করোনায় দরিদ্রদের জন্য নতুন বরাদ্দ নেই

আপলোড তারিখঃ 2021-06-02 ইং
করোনায় দরিদ্রদের জন্য নতুন বরাদ্দ নেই ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন: করোনার প্রভাবে দেশে কর্মহীন ও দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে নতুন কোনো বরাদ্দ থাকছে না। আগামী ৩ জুন বাজেট উপস্থাপনায় তাদের জন্য কোনো সুখবর দিচ্ছেন না অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে করোনার প্রভাব বাড়লে বিভিন্ন খাতের তালিকাভুক্তদের নগদ সহায়তা দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকায় তাদের চিহ্নিত করে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নতুন করে যোগ করা সম্ভব না হওয়ায় কর্মহীন কিংবা নতুন করে দরিদ্র হওয়াদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সমাজের কোন শ্রেণির জনগোষ্ঠীর ওপর করোনার প্রভাব কতটা পড়েছে, তার কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই। তবে সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপে দেখা গেছে, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে এই নতুন দরিদ্র শ্রেণির সংখ্যা জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থমন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, করোনা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত অর্থনীতি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর এর প্রভাব খতিয়ে দেখার কোনো চিন্তা আপাতত তাদের নেই। তবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বাজেটের পর প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর প্রভাব মূল্যায়ন করতে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করবে অর্থ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী অর্থবছর যে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হচ্ছে, প্রয়োজনে সেখান থেকে বিভিন্ন খাতে ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। তবে বছরজুড়ে ৩০ টাকা কেজি দরে ওএমএসে চাল-গম বিক্রির মাধ্যমে দরিদ্রদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে সরকার। পিপিআরসি ও বিআইজিডি জরিপে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। এ বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ৪৪ শতাংশ। এ হিসাব থেকে জাতীয় পরিসরে নতুন দরিদ্রের এ হিসাব (১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ) প্রাক্কলন করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কোভিডের আঘাত সব জায়গায় একইভাবে অনুভূত হয়নি। শহরের তুলনায় গ্রামে তার প্রভাব কমই দেখা গেছে। সে কারণে শহরের বস্তিবাসীর জীবন গ্রামের শ্রমজীবীদের তুলনায় অনেক বেশি অরক্ষিত। তিনি বলেন, গত বছর ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ বস্তিবাসী শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়, যাদের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এখনো ফেরেনি। প্রাক-কোভিড সময়ের তুলনায় শহরের বস্তিবাসীর আয় কমলেও খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় গত জুনের তুলনায় এ বছরের মার্চে দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি মনে করেন, ভাড়া বাড়িতে থাকা অধিকাংশ শহুরে দরিদ্রের জন্য এটি নির্মম বাস্তবতা। সবার সঞ্চয় কমেছে আশ্চর্যজনকভাবে। অরক্ষিত অদরিদ্র এবং দরিদ্র নয় এমন শ্রেণির মানুষের সঞ্চয়ের পরিমাণ কোভিড-পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়ে নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে সব শ্রেণিতেই ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। নতুন দরিদ্রদের জন্য আগামী বাজেটে বিস্তৃত আর্থিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ মহামারি আঘাত হানার পর থেকে তারা যা সরকারি সহায়তা পেয়েছেন তা ছিল অপ্রতুল। এখন তারা অভাব-অনটনে আছেন। অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে দরিদ্র ও কর্মহীনদের জন্য বেশ কিছু প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। ১২টি প্যাকেজের আওতায় সর্বমোট ২৪ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে এ উদ্যোগগুলো অদক্ষতা ও অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চ মাস পর্যন্ত সরকার বরাদ্দকৃত অর্থের ৩২ শতাংশ খরচ করতে পেরেছে। তবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ও শহরের দরিদ্রদের একটা বড় অংশের কাছেই সহায়তা পৌঁছেনি। অথচ এই শ্রেণির মানুষের দুর্দশা লাঘবেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একটি পরিপূর্ণ ডেটাবেস না থাকার কারণেই তারা বঞ্চিত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনেরা বলেছেন, যদি এ কর্মসূচিগুলো দ্রম্নত বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের উপার্জন পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না। বাংলাদেশ হোটেল-রেস্টুরেন্ট-সুইটমিট-বেকারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আক্তারুজ্জামান খান বলেন, এই খাতে কর্মরত মানুষেরা মহামারির পুরোটা সময় সরকারি কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি। তিনি বলেন, যদি সরকার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে সবার জীবন- জীবিকা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। সংগঠনটি প্রত্যেক বেকার কর্মীকে সহায়তা হিসেবে মাসিক ১০ হাজার টাকা করে বছরে কয়েক দফায় ভাতা দেওয়ার দাবি করেছে। আক্তারুজ্জামান বলেন, 'তবে কর্তৃপক্ষ আমাদের দাবিকে পাত্তা দেয়নি।' সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেছেন, আগামী বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করা উচিত। গত বছর যে পরিবারগুলো সহায়তা পেয়েছিল, এ বছরও সরকার তাদের আড়াই হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দিয়েছে। রায়হান বলেন, 'দরিদ্ররা যে ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন, সে অনুপাতে সাহায্য গ্রহীতার সংখ্যা এবং তহবিলের পরিমাণ যথেষ্ট নয়।' তিনি বলেন, কমপক্ষে ৫০ থেকে ৭০ লাখ পরিবারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা করে অন্তত তিন মাস ধরে অর্থ সহায়তা প্রয়োজন। উপার্জনক্ষম সদস্যরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে এরকম ৫০ লাখ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সরকার। কিন্তু কিছু অনিয়মের কারণে সংখ্যাটি কমে গিয়ে ৩৫ লাখে নেমে আসে। নতুন দরিদ্ররা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর কোনো তালিকায় জায়গা পায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এ অধ্যাপক বলেন, 'সামাজিক পুনরুদ্ধার ছাড়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।' বাংলাদেশ হকার ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের সভাপতি মো. মুরশিকুল ইসলাম বলেন, ফুটপাতের বিক্রেতাদের আয় কমে যাওয়ায় তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে এবং তারা সরকারের কাছ থেকেও তেমন কোনো সহায়তা পাননি। গত বছরের লকডাউনের সময় হকারদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের প্রায় ২০ শতাংশ এখনো কাজে ফিরতে পারেননি। সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা এবং হকারদের জন্য রেশন হিসেবে খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার দাবি জানিয়ে মুরশিকুল ইসলাম বলেন, 'আসন্ন বাজেটে আমাদের জরুরিভিত্তিতে নগদ অর্থ সহায়তা প্রয়োজন। এটি না পেলে হকারদের সমস্যাগুলো আরও অনেক বেড়ে যাবে।' সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বাজেটে নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে বর্ধিত বরাদ্দ দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল, যা জিডিপির ৩ দশমিক ০১ শতাংশ। সিভিল পেনশন বাদ দিলে, তা জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশ হবে। রহমান বলেন, সরকারের উচিত হবে পেনশন বাদে এটিকে বাড়িয়ে জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)