ছবির ক্যাপশন:
তিন ফ্রন্টে ক্রমবর্ধমান সঙ্কটের মুখে ইসরাইল; ৬৫ শিশু ও সাংবাদিকসহ নিহত ২২১; ৫২ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত
সমীকরণ প্রতিবেদন:
গাজা উপত্যকায় ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক আহ্বান উপেক্ষা করেই ইসরাইল হামলা অব্যাহত রেখেছে। এতে গাজা উপত্যকায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গতকাল বুধবার ভোরে ইসরাইলি বাহিনী গাজা ভূখণ্ডের দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষ্যস্থলগুলোতে গোলাবর্ষণ করেছে। এতে আরো চারজন নিহত হয়েছে। কিন্তু এই হামলা চালাতে গিয়ে আরো বড় সমস্যায় পড়ে গেছে ইসরাইল। তারা এখন তিন ফ্রন্টে ক্রমবর্ধমান সঙ্কটে পড়ে গেছে। গাজা উপত্যকার সঙ্কট তো আছেই। এর সাথে যোগ হয়েছে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে উত্তেজনা ও প্রতিবেশী লেবানন থেকে রকেট হামলা। তিন দিক থেকে সৃষ্টি এই সঙ্কট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ইসরাইল। আলজাজিরা, ডেইলি মেইল, বিবিসি ও রয়টার্স।
গাজায় ইসরাইলের এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বর্বরতা বন্ধে আন্তর্জাতিক আহ্বান সত্ত্বেও আশু যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত নেই। ইসরাইল গাজায় বোমা হামলা চালিয়েই যাচ্ছে, আর অপর দিক থেকে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা পাল্টা রকেট হামলা চালাচ্ছে। ইসরাইলি নেতারা বলেছেন, তারা হামাস ও ইসলামিক জিহাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে তাদের চাপে রাখছেন; কিন্তু এখনো গাজার এই গোষ্ঠীগুলোর হাতে ‘ছোড়ার মতো পর্যাপ্ত রকেট রয়ে গেছে’ বলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র ‘স্বীকার’ করেছেন। তাদের হিসাবে গাজার অস্ত্রাগারে এখনো ১২ হাজারেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও মর্টারের গোলা আছে বলে জানিয়েছেন ইসরাইলের ওই কর্মকর্তা। হামাসের ওপর হামলার জেরে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলের উত্তর সীমান্তে রকেট হামলা বাড়ছে। হিজবুল্লাহর মতো লেবাননের ‘সশস্ত্র গ্রুপগুলো’ ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামাসের প্রয়াসকে সমর্থন করছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, গত রাতে লেবানন থেকে ছয়টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়। তবে এগুলো সবই সীমান্ত প্রাচীরের মধ্যেই পড়ে। আর ইসরাইলি বাহিনী আর্টিলারি ব্যারেজের মাধ্যমে জবাব দিয়েছে। রকেট নিক্ষেপের ফলে উত্তর সীমান্তে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে, অধিবাসীদের বোমা শেল্টারের ভেতরেই থাকতে বলা হয়। হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
হামলা বন্ধের আহ্বান সৌদি আরবের :
সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফরহান বলেছেন, গাজায় ইসরাইলি হামলা পুরো অঞ্চলকে ভুল পথে ধাবিত করছে। তিনি সামরিক সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বিন ফারহান বলেন, ‘এটা আমাদের সবাইকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। এর অর্থ হলো আমাদের টেকসই শান্তির দিকে যাত্রার পথ আরো কঠিন হয়ে উঠছে।’ অন্য দিকে বিবিসি জানিয়েছে, ‘ইসরাইলে শান্তি ফেরাতে’ যত দিন প্রয়োজন তত দিন গাজায় হামলা চলবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। গাজায় ৯ দিনের গোলাবর্ষণে ‘হামাস অনেক বছর পিছিয়ে পড়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী। ফিলিস্তিনের হামাস ‘অপ্রত্যাশিত আঘাতের’ মুখোমুখি হয়েছে দাবি করে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরাইলি জনগণের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে যত দিন প্রয়োজন হামলা চলবে।
হামাস প্রধানকে হত্যার চেষ্টা :
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের কমান্ডারের বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইসরাইল। তেল আবিব বলছে, হামাসের সামরিক প্রধান মোহাম্মদ দাইফকে হত্যা করতে বেশ কয়েকবার চেষ্টা চালানো হয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে তাদের যুদ্ধ বিমান হামাসের অবকাঠামো এবং কমান্ডারকে লক্ষ্য করে গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে। গাজার কেন্দ্রস্থলে একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে ৭০টিরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে দুই হামাস সদস্য নিহত হয়েছে। গাজা উপত্যকার খান ইউনিসে হামাসের প্রশিক্ষণ শিবির লক্ষ্য করেও প্রায় ৫০টি হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) মুখপাত্র ব্রিগেডেয়ার জেনারেল হিদাই জিলবারম্যান বলেন, ‘পুরো অভিযান জুড়েই আমরা মোহাম্মদ দাইফকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছি। আমরা তাকে হত্যার বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছি।’ হামাসের সামরিক শাখা আল কাসসাম ব্রিগেডের প্রধান মোহাম্মদ দাইফ। বেশ কয়েকবারই হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গেছেন তিনি। ২০১৪ সালে গাজায় হামলার সময়েও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি নেপথ্যেই থাকেন। তার অবস্থান কখনোই প্রকাশ করা হয় না। ইসরাইলি হামলার জবাবে ফিলিস্তিন থেকে রকেট ছোড়াও অব্যাহত রয়েছে। রাতভর ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চল থেকে সতর্কতামূলক সাইরেনের শব্দ শোনা গেছে।
ইসরাইলি হামলায় ৫২ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত : জাতিসঙ্ঘ
ইসরাইলি হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত ৫২ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৪৫০ ভবন। গত মঙ্গলবার ইসরাইল-ফিলিস্তিনের সংঘাতে সৃষ্ট এ চিত্র তুলে ধরেছে জাতিসঙ্ঘ। জাতিসঙ্ঘের অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচএ) মুখপাত্র ইয়েন্স লেয়ার্কে বলেন, গাজায় জাতিসঙ্ঘের পরিচালিত স্কুল রয়েছে ৫৮টি। এতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৪৭ হাজার ফিলিস্তিনি। বিমান হামলায় ৪৫০ ভবনের মধ্যে ছয়টি হাসপাতাল ও ৯টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে। এই হামলার কারণে সুপেয় পানি ও রান্নার কাজে ব্যবহৃত জ্বালানির সঙ্কটে পড়েছেন প্রায় আড়াই লাখ গাজাবাসী। লন্ডনভিত্তিক বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, ইসরাইল যেভাবে ফিলিস্তিনের আবাসিক এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে, তা যুদ্ধাপরাধের সমান। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের তারা টার্গেট করছে না। অথচ স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত গাজায় ২২১ নিহতদের মধ্যে রয়েছে ৬৫ জনই শিশু। দু’দিন আগেথশিশুসংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, গাজায় প্রতি ঘণ্টায় তিন শিশু হতাহত হচ্ছে।
এ দিকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘের প্রধান অ্যান্তোনিও গুতেরেস। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, অবরুদ্ধ গাজায় মানবিক দুর্দশা এবং ঘর-বাড়ি ও অত্যাবশ্যক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে দেখছি আমরা। এর আগে জাতিসঙ্ঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান মার্ক লোকক গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানান। গত মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে মাত্র ২৫ মিনিটে উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ১২২টি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এ হামলায় অন্তত ৬০টি যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করেছে ইসরাইলি বাহিনী। তারা গাজায় হামাসের সুড়ঙ্গ ও ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অন্তত ৬৫টি স্থানে হামলার দাবি করেছে। অপর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ‘যুদ্ধবিরতির’ আহ্বানের পরও গাজা উপত্যকায় বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। এ ছাড়া গাজা উপত্যকায় দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত বিমান হামলায় ইউসুফ আবু হুসেন নামে একজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তিনি ‘আল-আকসা ভয়েস’ নামে একটি রেডিওতে কর্মরত ছিলেন। মঙ্গলবার রাতে ইসরাইলি বাহিনীর নৃশংস হামলায় তিনি নিহত হন।
