ছবির ক্যাপশন:
নেই শোভাযাত্রা-ঢাক-ঢোলের আওয়াজ, নেই শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা তরুণ-তরুণীদের ভিড়
দিনভর পুলিশি টহল, ফাঁকা শহরের হাহাকার অবস্থা, নেই ব্যবসায়ীদের ঐতিহ্য ‘হালখাতা’
সমীকরণ প্রতিবেদন:
করোনাভাইরাস নামক অণুজীবের কারণে এবারও পয়লা বৈশাখ যা কি না, বাঙালির সার্বজনীন উৎসব, তা পালিত হয়েছে উৎসবহীনভাবে; গৃহবন্দি থেকে। বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই দেশে শুরু হয়েছে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’। তাই এবার ভিড়ে নয়, নীড়েই পালিত হয়েছে বর্ষবরণ উৎসব।
সড়ক সুনসান। কোথাও শোভাযাত্রা নেই, ঢাক-ঢোলের আওয়াজ নেই। মাঝে মাঝে কেবল পুলিশের বাঁশির শব্দ ভেসে আসছিল। চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসও ফাঁকা। চুয়াডাঙ্গা চাঁদমারি মাঠের সেই মেলা নেই, সাউন্ড সিস্টেম থেকে ভেসে আসা বাউল সুর নেই, উজ্জ্বল রঙের আর শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা তরুণ-তরুণীদের ভিড়ও নেই। এ যেন এক অন্য পয়লা বৈশাখ। অন্য নববর্ষ। অনলাইনে কেউ গাইছে হয়তো, কিন্তু জনারণ্য থেকে ভেসে আসছে না বৈশাখের সেই আগমনী গান- ‘এসো হে বৈশাখ’, কোথাও বাজছে না- ‘মেলায় যাইরে’। সুর নেই, রং নেই, প্রাণের উচ্ছ্বাস নেই।
পূর্ব দিগন্তে যে সূর্য উদিত হয়েছিল, তা প্রতিদিনকার মতো হলেও সে নিয়ে এসেছিল এক নতুন বার্তা। নতুন দিনের বার্তা। এ যে নতুন বছরের প্রথম সূর্যোদয়। এক আজব অসুখ এসেছে পৃথিবীতে। যা কেড়ে নিয়েছে মানুষের সব উদ্যাপন আর উৎসব। রূদ্ধ করে দিয়েছে মানুষে মানুষে মিলনের পথ।
বাঙালির আত্মোপলব্ধি আর আত্মজাগরণের কবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী, কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ!’ কিন্তু এবার প্রতিদিনকার ক্ষুদ্র মানুষের মহৎ হয়ে ওঠার আর সুযোগ কই! মানুষের সঙ্গে একত্র হওয়ার সুযোগই যে বন্ধ! মিলনের এই উৎসবের দিনেও শহরে মাইক লাগিয়ে প্রচারণা চলছে- ‘দূরত্ব বজায় রাখুন’, ‘জনসমাগম এড়িয়ে চলুন’। গতবছরও এমন হয়েছিল। করোনার কারণে গত নববর্ষও কেটেছে ঘরে বসে, উৎসবহীনভাবে। গত বছর মনে হয়েছিল, এই বছরটা অন্তত বেঁচে থাকা যাক। আগামীবার উৎসব হবে। কিন্তু করোনা এমন ঘাঁটি গেড়েছে যে, তা আর সহজে যেতে চাচ্ছে না। এবার বরং আরও জেঁকে বসেছে। ফলে আজ থেকে ঘর হতে বের হওয়া বারণ।
চুয়াডাঙ্গার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা মনে করেন, আগে জীবন, পরে উৎসব। বেঁচে থাকলে অনেক উৎসব করা যাবে। আর বেঁচে থাকার জন্য এখন ঘরে থাকা প্রয়োজন। তাঁরা জানান, প্রতিবছর তাঁরা বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের আয়োজন করেন। এবার সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও করোনার কারণে উৎসব বন্ধ রেখেছেন। তাঁরা আশা করছেন, আগামী বছর করোনা চলে যাবে। আগামী বছর আরও বড় করে উৎসব হবে।
রানা নামের করে সাংস্কৃতিক কর্মী বলেন, এই যে দুই বছর ধরে উৎসব হচ্ছে না, এ জন্য সবার মনের ভেতরেই একটা খারাপ লাগা আছে। করোনা চলে গেলে মুক্ত হাওয়ায় উদ্যাপনের তাড়না আছে। এটা সব সম্প্রদায়ের সব বাঙালির উৎসব। এটা সব সময়ই থাকবে।
সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গা শহর ঘুরে দেখা গেছে, রঙিন পোশাকে নর-নারী নয়, পয়লা বৈশাখে রাস্তায় কেবল পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। অন্যবারের মতো শহরের সেই সাজ সাজ রব ছিল না। ছিল ফাঁকা শহরের হাহাকার মতো অবস্থা। রাস্তায় খুব একটা মানুষ বের হতে দেখা যায়নি। যদিও দু-একজন বেরিয়েছেন, তাও প্রয়োজনে।
নতুন বছরের প্রথম দিনে দোকানে দোকানে হালখাতাও বাঙালির ঐতিহ্য। দোকানে আসা ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হয়, মিষ্টি খেয়ে পুরোনো ক্রেতারা পরিশোধ করে যান বকেয়া টাকা। তবে দুই বছর ধরে এই আয়োজনও বন্ধ রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা কোর্ট মোড়ের ব্যবসায়ী আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা হালখাতা করি। এটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। বছরে এই একটিবার নতুন-পুরোনো সব ক্রেতাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত হয়। কিন্তু দুই বছর ধরে করোনার কারণে এই আয়োজন হচ্ছে না। এতে ব্যবসায়িকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
