ছবির ক্যাপশন:
সময়ের সমীকরণ-এর সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক বিশেষ অনুষ্ঠান ‘সমীকরণ সংলাপে’ অতিথিরা
স্বীকৃতি আদায়ে এমপি ছেলুন জোয়ার্দ্দার সংসদে প্রস্তাবও রেখেছিলেন, অন্য এমপিরা সমর্থন করেননি
https://youtu.be/LI8wwILn8e0
ফেরদৌস ওয়াহিদ:
১০ এপ্রিল ছিল চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী দিবস। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকলেও স্থানীয়ভাবে দিবসিট পালন করা হয়। একই সঙ্গে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনও চলমান রয়েছে। এসব নিয়ে গতকাল শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় দৈনিক সময়ের সমীকর-এর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ‘নন্দিত বিচিত্রা’ থেকে সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক ‘সমীকরণ সংলাপ’ সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে। পত্রিকার বার্তা সম্পাদক হুসাইন মালিকের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারে প্যানেল প্রযোজক ছিলেন পত্রিকার ডেস্ক ইনচার্জ ফেরদৌস ওয়াহিদ ও রুদ্র রাসেল। দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এর প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপনের পরিচালনা ও সঞ্চালনায় গতকালের সংলাপে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অতিথি হিসেবে সরাসরি আলোচনা সভায় অংশ নেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম মালিক, চুয়াডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধা ইতিহাস গবেষক ও বিশিষ্ট লেখক রাজিব আহমেদ, প্রথম রাজধানী বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব হাবিবি জহির রায়হান এবং চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন মশিউর রহমান। অনুষ্ঠানটির স্পন্সর ছিল অনলাইন কেনাকাটার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান চুয়াডাঙ্গা সদরের মোমিনপুর ইউনিয়নের নীলমনিগঞ্জে অবস্থিত ‘আদিয়ান মার্ট’ এবং চুয়াডাঙ্গা নিউ মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত পোশাকের ব্রান্ড শপ ‘নন্দন’।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রথমেই বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম মালিকের কাছে প্রশ্ন করা হয়- চুয়াডাঙ্গা যে বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী এটা নিয়ে বিতর্ক আছে, আমরা এই বিতর্কের কেন অবসান ঘটাতে পারলাম না? কেন এটা রাষ্ট্রীয় নতিভুক্ত হলো না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটা যুদ্ধবিধস্ত দেশ। সেই সময়ে যারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁরা হয়তো সেভাবে বিষয়টা উপস্থাপন করেননি। তখন যে সংসদ বসেছে, সেই সংসদেও বিষয়টা ওইভাবে উপস্থাপিত হয়নি।’
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন, তিনিও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। চুয়াডাঙ্গা প্রথম রাজধানী স্বীকৃতির ব্যাপারে ওনার সঙ্গে আপনাদের কখনো আলোচনা হয়েছে কি না, উপস্থাপকের এমন প্রশ্নের উত্তরে নুরুল ইসলাম মালিক বলেন, ‘এমপি ছেলুন জোয়ার্দ্দারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। উনি চেষ্টা করেছেন। সংসদে প্রস্তাব রেখেছেন, কিন্তু কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, যশোরসহ আশপাশ জেলার সাংসদরা সেসময় এ প্রস্তাবে সমর্থন করেননি।’
অনুষ্ঠানের অন্যতম আলোচক চুয়াডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস গবেষক ও বিশিষ্ট লেখক রাজিব আহম্মেদ বলেন, ‘১৯৭১ সালে চুয়াডাঙ্গাকে প্রথম অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়েছিল, এটার প্রত্যোকটার সপক্ষে তথ্য-উপাত্ত সবই রয়েছে। আমি চুয়াডাঙ্গার ওপরে একাধিক বই লিখেছি, এর মধ্যে একটি ‘মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর’ এই বইটার মধ্যে আমি মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাস তুলে ধরেছি। কে, কবে, কোথায়, কীভাবে চুয়াডাঙ্গাকে প্রথম রাজধানী ঘোষণা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বড় বড় নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন, বিশেষ করে আসহাবুল হক, আবু ওসমান চৌধুরী কী বলেছেন সব এই বইয়ে আছে। তাঁরা স্বাধীনতার দলীলপত্রে যে কথাগুলো বলেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন হাসান হাফিজুরের রহমানের কাছে। সেখানে চুয়াডাঙ্গা যে প্রথম রাজধানী ছিল, সে কথা তাঁরা বলেছেন। আমি আরেকটা বইয়ের কথা আপনাদের বলতে চাই, এটা ড. সুকুমার বিশ্বাসের লেখা ‘মুজিবনগরের ডকুমেন্টস’। বইটার মধ্যে উনি চুয়াডাঙ্গা যে বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী ছিল, সে বিষয়ে খুব চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল কলকাতার দ্যা হিন্দু পত্রিকার ৮ কলামের হেডলাইন হচ্ছে ‘Mujib’s Mens Abondon Chuadanga Set up New Headquarter’ অর্থ্যাৎ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই যুদ্ধটা অবশ্যই একটি স্বাধীন দেশের জন্য, আর স্বাধীন দেশ মানেই কিন্তু একটি রাজধানী থাকবে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার হেডকোয়ার্টার চুয়াডাঙ্গা। এর চেয়ে বড় ডকুমেন্ট তো আর কিছু হতে পারে না। যারা মনে করেন ডকুমেন্টস নাই, তাঁরা আসলে ডকুমেন্টগুলো খুঁজে দেখার চেষ্টা করছেন না।
আমরা যদি বিশ্বাস করি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস, এই দিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তাহলে একটা কথা খুব পরিষ্কার, যেদিন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা হয়েছে, সেদিন থেকে আমরা স্বাধীনতা পেয়ে গিয়েছি। শুধুই স্বাধীন দেশই পাইনি, স্বাধীন দেশ মানে দেশের একটি রাজধানী থাকবে। যদি কেউ মুজিবনগরকে অস্থায়ী রাজধানী বলতেও চায়, সেটা হচ্ছে ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণের দিন থেকে। ২৬ মার্চ যেদিন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল, সেদিন থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত তাহলে রাজধানী কোথায় ছিল, মুজিবনগর? কখনো না, তখন কিন্তু অস্থায়ী রাজধানী ছিল চুয়াডাঙ্গা। চুয়াডাঙ্গায় হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী। যদি ২৬ মার্চ দেশ স্বাধীন হয়ে থাকে, ২৬ মার্চ যদি দেশের যাত্রা শুরু হয়ে থাকে, তাহলে ২৬ মার্চ রাজধানী হিসেবে চুয়াডাঙ্গার যাত্রাও শুরু হয়েছে। এবং ১০ এপ্রিল সেটার স্বীকৃতি পাওয়া গিয়েছে।
স্বীকৃতি কীভাবে পাওয়া গিয়েছে একটু বলি- ১৯৭০ একটি নির্বাচন হয়েছিল, ওই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সকল আসনই পেয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যারা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা। পরে তাঁদের অনেকেই ভারতের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে তাঁদের আগরতলায় একত্রিত করা হয়। সেখানে তাঁরাই ছিলেন, যারা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। সেখানে যারা এমএলএ-এমপি ছিলেন, তাঁরা সকলে মিলে একটা সিদ্ধান্ত নেন যে আমরা একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করব, এই সরকারের রাজধানী হবে চুয়াডাঙ্গা। এবং সেটি বিবৃতি আকারে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল এবং সেটি প্রচার হয়েছিল। আবু ওসমান চৌধুরী সাহেবের বই ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সেই বইটার মধ্যে তিনি উল্লেখ করেছেন ১০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গাকে প্রথম অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়।
আপনারা যেনে মজা পাবেন, মেহেরপুরের ইতিহাস প্রথম লিখেছিলে সৈয়দ আমিনুল ইসলাম নামের এক অ্যাডভোকেট। তিনি ইতোমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর বইয়ের মধ্যেও পরিষ্কারভাবে লেখা আছে ১০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। সুতরাং এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। এবং চুয়াডাঙ্গা যে প্রথম অস্থায়ী রাজধানী, তার স্বীকৃতি কিন্তু আমরা আস্তে আস্তে পাচ্ছি। আপনারা নিশ্চয় জানেন, আনোয়ার হোসেনের সম্পাদনায় চুয়াডাঙ্গায় একটি পত্রিকা রয়েছে। যার নাম দৈনিক প্রথম রাজধানী। যদি চুয়াডাঙ্গা প্রথম রাজধানী না হতো, তাহলে কার ক্ষমতা আছে সরকারের কাছ থেকে রাজধানীর নামের পত্রিকা প্রকাশের জন্য ছাড়পত্র বের করে নিয়ে আসতে। আপনারা জানেন, চুয়াডাঙ্গায় একটি ইউনিভার্সিটি আছে, যেটার নাম ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। যদি চুয়াডাঙ্গা ফার্স্ট ক্যাপিটাল না হতো, তাহলে চুয়াডাঙ্গাবাসী চাইলেই কি সরকার তার স্বীকৃতি দিত। আমি মনে করি আমাদের স্বীকৃতি আছে, নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গায় বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী। ১৪ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতো, কিন্তু যেহেতু এটা গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়ে যায়, তখন পাকিস্তান বাহিনী এখানে বোমা বিস্ফোরণ করে। এবং এ অবস্থায় তো আর জাতীয় নেতৃবৃন্দকে এখানে আনা সম্ভব না, তখন সিদ্ধান্ত হয়, সীমান্তের খুব কাছাকাছি একটা জায়গায় আমরা শপথ গ্রহণ করব, যাতে ইন্ডিয়া থেকে ভেতরে প্রবেশ করে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষ করে আবার চলে যাওয়া যায়। শুধুমাত্র সীমান্তবর্তী স্থান হওয়ার কারণেই, একমাত্র ভৌগোলিক অবস্থার কারণেই মুজিবনগর অস্থায়ী রাজধানীর স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছে।
প্রথম রাজধানী বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব হাবিবি জহির রায়হান বলেন, ‘জেলা হিসেবে আমাদের জাতীয়ভাবে একটি পরিচয় থাকা দরকার। আমাদের পরিচয়টা হতে পারে চুয়াডাঙ্গা প্রথম রাজধানী স্বীকৃতি পেলে। সেটাকে সামনে নিয়ে আসার জন্য ২০১৪ সাল থেকে আমরা এই আন্দোলনে আছি। ১৪ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৭ এপ্রিল যে মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে, সেই বিষয়েও আমরা কোথাও প্রমাণ পাইনি। ১৪ তারিখে এখানে না হওয়ার কারণে নেতৃবৃন্দ ইন্ডিয়া ফিরে গেছেন। ইন্ডিয়ায় শপথ অনুষ্ঠিত হতে পারত, কিন্তু পাকিস্তান যাতে কোনোভাবেই দোষারোপ করতে না পারে যে ইন্ডিয়ার মদদে স্বাধীনতা সংগ্রাম হচ্ছে। তাই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে শপথের জন্য মুজিবনগরকে বেছে নেওয়া হয়। মুজিবনগরের অনুষ্ঠানের দৈর্ঘ্য ছিল দেড় ঘণ্টা। সেখানে ছিল একটি আমবাগান। সেখানে রাজধানী হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। রাজধানী চুয়াডাঙ্গা, এখান থেকেই সবকিছু করা হতো। কিন্তু এখন বিতর্কিত করা হচ্ছে ভেতর থেকে। মুজিবনগরকে কখন, কে, কীভাবে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করল, সেটার ডকুমেন্টস কিন্তু কেউ চায় না। তারপরেও মুজিবনগর অস্থায়ী রাজধানীর স্বীকৃতি পেয়েছে। শপথ হলেই যে রাজধানী হবে, সেখানে ঘর নেই, বাড়ি নেই, বাজার নেই, কীভাবে রাজধানী হয়ে গেল? যাইহোক চুয়াডাঙ্গা যে বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী, তার সব ডকুমেন্টস আমাদের আছে।’
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে গবেষক ও লেখক রাজিব আহম্মেদ বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার মুক্তিযুদ্ধে যে ব্যক্তিটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি হচ্ছেন ডা. আসহাবুল হক। তিনি ওই সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাবান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মতো ক্ষমতাবান বর্তমান সাংসদও নন। সেই সময়ে তিনি এসব ইতিহাস লিখে যাননি। ইতিহাস লিখতে হবে কেন, তিনি নিজেই তো ইতিহাস। এই রকমই মনোভাব ছিল তখনকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, তিনি যদি ক্ষমতাশালী থাকা অবস্থায়, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এগুলো ডকুমেন্টেশন করে ফেলতেন, তাহলে আজকে আমাদের এসব নিয়ে আফসোস করতে হতো না। আমাদের এখন উত্তরণের পথ হলো- আমাদের দিনগুলো আমাদের উদ্যাপন করতে হবে, আমাদের ইতিহাসগুলো আমাদের ধরে রাখতে হবে। চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী দিবস নিয়ে দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এটার জন্য পত্রিকা সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী ফেসবুক গ্রুপ, এই গ্রুপটি তো অন্য নামেও হতে পারত। এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই এক সময় আমাদেরকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। স্বাধীনতার এই ৫০ বছর পরেও আমরা এটা নিয়ে যার যার মতো চেষ্টা করছি, এক সময় আমরা অবশ্যই প্রথম রাজধানীর মর্যাদা পাব এবং বিশ্ববাসী জানবে চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী। এটাই সত্য, এটাই বাস্তবতা। প্রত্যোকে স্ব স্ব জায়গা থেকে এই আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে।’
মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গার ইতিহাস নিয়ে কীভাবে সামনে এগিয়ে যেতে পারি বা কীভাবে উন্নয়নকাজ করতে পারি, এমন প্রশ্নের জবাবে হাবিবি জহির রায়হান বলেন, ‘আমাদের চুয়াডাঙ্গার ইতিহাস-ঐতিহ্যর ধারক-বাহক হলো পুরাতন পোস্ট অফিস। সেটা রেখে উন্নয়ন কাজ করা যেত, কিন্তু সেটা ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাবুলাল আগরওয়ালার বাড়িটি ধ্বংস হতে হতে নিঃশ্বেষ প্রায়। এগুলো শুধু মুক্তিযুদ্ধ বা প্রথম রাজধানী না, এগুলো একশ বছরের অধিক সময়ের ঐতিহ্য বহন করে। শ্রীমন্ত টাউন হল, সেটাও ভেঙে ফেলার জন্য মাটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। আমরা দেখছি, আমরা মন্ত্রীর কাছে পর্যন্ত গিয়েছি। শিল্পকলার জন্য অন্য স্থানে জমি ডিসি সাহেব নিয়ে বসে আছেন। তারপরেও কয়েকদিন পরপর এখানে মাটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এখানে বহুতল ভবন তৈরি হবে। অ্যাসোসিয়েশন হলটা একটা স্মৃতি, সেটার ভাঙার জন্য মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে। যারা প্রথম রাজধানীর স্বীকৃতি চাই, তাদের প্রথমেই মনে রাখতে হবে প্রথম রাজধানীর সাথে এই স্থাপনাগুলো জড়িত। এগুলো না থাকলে হাজার বছর আন্দোলন করেও কোনো লাভ হবে না।’
চুয়াডাঙ্গার ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে জনমত গড়ে তোলা যায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ‘চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী’ ফেসবুক গ্রুপের পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, অবশ্যই চুয়াডাঙ্গার ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য আমরা জনমত গঠনে প্রতিনিয়ত প্রচারণা চালাচ্ছি।
চুয়াডাঙ্গার ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের ব্যাপারে রাজিব আহম্মেদ বলেন, ‘প্রত্মতাত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের কিছু নিয়ম-নীতি আছে। যদি সরকার বা কোনো কর্তৃপক্ষ পুরোনো স্থাপনাকে অক্ষত অবস্থায় রাখতে চায়, তাহলে অক্ষত রাখতে পারে। বাস্তবতা হলো আমাদের চুয়াডাঙ্গার যে স্থাপনাগুলো মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে স্মারক হিসেবে যুক্ত, এইগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য আমরা সত্যিই মন থেকে কতটুকু আন্তরিক, এটা নিয়ে আমার কাছে একটু প্রশ্ন আছে। আমরা অনলাইনে এসে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলি, নিজেকে নায়ক প্রমাণের চেষ্টা করি, আসলে কি আল্টিমেটলি অন্তর দিয়ে সে জিনিসটা চায়? সত্যিই শ্রীমন্ত টাউন হল টিকে থাকুক। আমরা কি সত্যিই চায়? অ্যাসোসিয়েশন হল টিকে থাকুক। আমরা কিন্তু সেটা চায় না। কারণ আমাদের সবার মধ্যে একটা কমার্শিয়াল মানসিকতা ঢুকে গিয়েছে। আমরা চিন্তা করি অ্যাসেসিয়েশন হলের জায়গাটা এত সুন্দর একটা জায়গা, এখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলে কতো ভালো বা কত টাকায় না ইনকাম হবে। আমরা সবাই টাকার মোহে পড়ে গিয়েছি। এটাই কিন্তু বাস্তবতা। যখন সরকার থেকে অ্যাসোসিয়েশন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বাজেট চলে আসবে, তখন একদল বলবে এটা ভাঙা যাবে না। অন্য দল বলবে তোমরা কি চুয়াডাঙ্গার উন্নয়ন চাওনা? আধুনিক অবস্থা চাওনা? যুগের সাথে তালমিলিয়ে সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটে। আমরা চাইলেও অ্যাসোসিয়েশন হল আরও ৫০ বছর রাখতে পারব না। অবশ্যই বাজেট আসবে, নতুন ভবন নির্মাণ হবে। তবে আমরা চাই, বর্তমান অ্যাসোসিয়েশন হলের আদলে আরেকটি ভবন নির্মাণ করা। তাহলে অ্যাসোসিয়েশন হলের স্মৃতিচিহ্নটা থেকে যাবে।’
