ছবির ক্যাপশন:
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বোরোর পর আমন সংগ্রহেও চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে খাদ্য অধিদফতর। এক দফা সময় বাড়িয়েও সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও যাওয়া যায়নি। এবারের মৌসুমে আমন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ লাখ ৫৮ হাজার টন। গতকাল সোমবার পর্যন্ত আমন সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৭৮ হাজার ৬০৬ টন। যা মোট লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১০ শতাংশ। অথচ বর্ধিত সময় শেষ হচ্ছে আগামী ১৫ মার্চ। অর্থাৎ বাকি এক সপ্তাহে কোনোভাবেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে আমন সংগ্রহের। গত বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে সাড়ে ২১ লাখ টন বোরো ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা। অথচ সংগ্রহ বোরো সংগ্রহ করা গিয়েছিল মাত্র ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৯১৭ টন (ধান-চালসহ)। বোরো এবং আমন সংগ্রহে ব্যর্থতার কারণেই দেশে চালের বাজার চরম অস্থির বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এ ব্যর্থতার কারণেই সরকারি খাদ্য মজুদ বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। আর সরকারি মজুদ কমে যাওয়ায় চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীরা বাজার সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছেন বলে মনে করছেন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান।
এদিকে বোরো ও আমন সংগ্রহে ব্যর্থতার প্রধান কারণ মিলমালিকরা চুক্তি করেও চাল সরবরাহ না করা। এ ক্ষেত্রে মিলমালিকদের ভাষ্যÑ সরকার যে ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে সেটি বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম। সে দামে মিলমালিকদের পক্ষে চাল সরবরাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং চাল কল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ সোমবার বলেন, মিলমালিকরা অনেকটা বাধ্য হয়ে সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে। আর সরকার যে ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে সে দামে চাল সরবরাহ করা মিলমালিকদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না। কারণ সরকার চালের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৭ টাকা। এই মোটা চাল এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকায়। কেজিতে ১৫ টাকা ব্যবধান। একজন মিলমালিক যদি ১০০ টন চাল দেন তা হলে তার ১৫ লাখ টাকা লোকসান হবে। কোনো মালিকই সাধারণত ৪০০-৫০০ টনের নিচে চুক্তি করে না। সে ক্ষেত্রে যদি একজন মিলমালিক ৫০০ টন চাল দেয় সরকারকে তা হলে তার লোকসানের পরিমাণ কোটি টাকার কাছে চলে যাবে। তা হলে এত লোকসান দিয়ে মিলমালিকরা কীভাবে টিকে থাকবে।
খাদ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এবারের আমন মৌসুমে মোট ৮ লাখ ৫৮ হাজার টন খাদ্যশষ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ধান ছিল ২ লাখ ৮ হাজার টন, সিদ্ধ চাল ৬ লাখ টন এবং আতপ চাল ৫০ হাজার টন। এ লক্ষ্যার্জনে মিলমালিকদের সঙ্গে চুক্তি করেছিল সরকার। আমন সংগ্রহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় প্রথমে ২৮ ফেব্রুয়ারি। এ সময়ের মধ্যে সংগ্রহ করা যায় খুবই যৎসামান্য। ফলে সময় বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় চলতি ১৫ মার্চ পর্যন্ত। সে হিসাবে আমন সংগ্রহের সময় শেষ হতে বাকি আর মাত্র ৭ দিন। অথচ সোমবার পর্যন্ত আমন সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৭৮ হাজার ৬০৬ টন। এর মধ্যে সিদ্ধ চাল ৬৫ হাজার ৯৮১ টন, আতপ চাল ৪ হাজার ৭২০ টন এবং ধান ১১ হাজার ৮৯৪ টন। সুতরাং আর মাত্র ৭ দিন রইল আমন সংগ্রহ, এখনও বাকি আছে ৯০ শতাংশ।
সংগ্রহের সময় শেষ হয়ে এলেও এখনও খাদ্য অধিদফতর নতুন করে আর সময় বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ বিষয়ে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কথা বলতে চাননি। তবে অধিদফতরের উপপরিচালক (অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ) মো. হারুন-অর-রশিদ সোমবার বলেন, আমন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ হলেও নতুন করে আর সময় বাড়ানো হবে কি না এ ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। চাল সংগ্রহ কার্যক্রম ব্যর্থ হলো কেনÑ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে এবার আমন মৌসুমে ধানের উৎপাদন কম হয়েছে, তা ছাড়া বাজারও চড়া। এ জন্য মিলমালিকরা চুক্তি করেও চাল দেয়নি খাদ্য অধিদফতরকে। তবে যেহেতু তারা চুক্তি করেও চাল দেয়নি সেহেতু তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। গত বোরো মৌসুমে যারা ব্যর্থ হয়েছিল চাল দিতে তাদেরও লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
এদিকে চাল সংগ্রহের পরিমাণ না বাড়ায় সরকারের গুদামে চালের মজুদ আরও কমে গেছে। সোমবার পর্যন্ত সরকারের গুদামে চালের মজুদ রয়েছে মাত্র ৫ লাখ ২৯ হাজার ১৬৬ টন। এ ছাড়া গমের মজুদ রয়েছে মাত্র ৯৮ হাজার ৫০০ টন এবং ধানের মজুদ মাত্র ৪ হাজার ৯৪২ টন। সব মিলে সোমবার পর্যন্ত সরকারের গুদামে খাদ্য মজুদ রয়েছে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৯৫০ টন। অথচ গত বছরের একই দিনে চাল মজুদ ছিল ১১ লাখ ৭ হাজার ৫৬০ টন। আর মোট খাদ্য মজুদ ছিল ১৪ লাখ ৫৩ হাজার ৯২৮ টন। অভ্যন্তরীণ মজুদ বাড়ানো না যাওয়ায় সরকার আমদানি করে চালের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু সে ক্ষেত্রেও সফল হওয়া যাচ্ছে না। চালের মজুদ বাড়াতে সরকারি পর্যায়ে ১০ লাখ টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ১০ লাখ- মোট ২০ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমদানিকারকরাও মিলমালিকদের মতো সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেও চাল আমদানি করছেন না। তা ছাড়া সরকারি পর্যায়ে যে ১০ লাখ টন চাল আমদানির কথা তাতেও কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে সোমবার পর্যন্ত জাতীয় দরপত্রের মাধ্যমে এক কেজি চালও আমদানি করা যায়নি। বেসরকারি পর্যায়ে সোমবার পর্যন্ত ২ লাখ ৯২ হাজার ৬২০ টন চাল আমদানি করা গেছে। সুতরাং শিগগিরই চালের মজুদ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং চাল কল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, ‘চালের দাম কমবে এ রকম কোনো আশার কথা এই মুহূর্তে শোনানো যাচ্ছে না। তবে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ মজুমদারের সঙ্গে আজ (গতকাল) আমার কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, সামনে রোজার মাস আসছে, চালের দাম যেন আর না বাড়ে। আমি তাকে বলেছিÑ আমরা মিলমালিকরাও চেষ্টা করব যাতে আর চালের দাম না বাড়ে। তবে বাজার স্বাভাবিক করতে বা চালের দাম কমাতে এই মুহূর্তে চাল আমদানির বিকল্প নেই। সার্বিক বিষয়ে মন্তব্যের জন্য খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে কথা বলার জন্য তার দুটি মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সে কারণে এ বিষয়ে তার মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
