ছবির ক্যাপশন:
নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেটে ১৩ বছরের শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলায় প্রধান আসামি কামরুল ইসলামসহ চারজনকে বিচারিক আদালতের দেয়া মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এছাড়া ওই ঘটনা মোবাইলে ধারণ করার অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত নূর মিয়ার সাজা কমিয়ে তাকে ৬ মাসের কারাদ- দিয়েছেন আদালত। দ-প্রাপ্ত অন্য ৫ আসামিকে বিচারিক আদালতের দেয়া বিভিন্ন মেয়াদের দ- বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রাজনকে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদ-প্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদ- অনুমোদন) ও আপিলের শুনানি গত ১২ই মার্চ শেষ হয়। শুনানি শেষে রায়ের জন্য ১১ই এপ্রিল (গতকাল) দিন ধার্য করেন আদালত। এ মামলায় বিচারিক আদালত আসামি কামরুল ইসলাম, ময়না চৌকিদার, তাজউদ্দিন আহমেদ বাদল ও জাকির হোসেন পাভেল আহমদকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন। গতকাল হাইকোর্টের রায়ে এ চারজনের মৃত্যুদ- বহাল রয়েছে। এছাড়া রাজনকে নির্যাতনের ঘটনা মোবাইলে ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে বিচারিক আদালত কামরুলের (মৃত্যুদ-প্রাপ্ত) সহযোগী আসামি নূর মিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছিল। গতকাল হাইকোর্টের রায়ে তাকে ৬ মাসের কারাদ- দেয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নিম্ন আদালতের রায়ে কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ও শামীম আহমেদকে সাত বছর করে কারাদ- দেয়া হয়। এছাড়া দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীকে ১ বছর করে কারাদ- দেন বিচারিক আদালত। গতকাল হাইকোর্টের রায়ে এই ৫ জনের সাজা বহাল রয়েছে। গতকাল ঘোষিত রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, রাজনকে নির্যাতনের পর পানি না দেয়ার ঘটনাটি অমানবিক। তারা (আসামিরা) সেখানে মানবিকতা হারিয়ে পশুর মতো আচরণ করেছে। শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে জন্য রাষ্ট্রসহ সবাইকে সচেতন থাকা, এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং আইন সম্পর্কে সচেতনতার বিষয়টি পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন। পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, সাধারণ ব্যক্তি যদি কোনো অভিযোগে কাউকে ধরে, এক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বা ধারণা সঠিক নাও হতে পারে। তাই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দিতে হবে। এক্ষেত্রে কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়। রাজন হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে কামরুল ইসলামসহ চারজনের ফাঁসির রায় বহাল থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান আলম। রায় যেন দ্রুত কার্যকর হয় সে কামনা করেছেন তিনি। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আতিকুল হক সেলিম মানবজমিনকে বলেন, আদালত বলেছেন রাজনের সঙ্গে আসামিরা যে আচরণ করেছে একমাত্র পশুরাই এ ধরনের আচরণ করতে পারে। তিনি বলেন, কোনো অভিযোগে কাউকে যদি ধরা হয় সেক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে বলেছেন আদালত। এছাড়া রাজনের মতো ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য রাষ্ট্রসহ সকলকে সচেতন হওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেছেন। ২০১৫ সালের ৮ই জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চুরির অভিযোগ এনে ১৩ বছরের শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীদের এক সহযোগী (নূর মিয়া) নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়। পরে এ দৃশ্য দেখে সারা দেশে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ঘটনায় দায়ীদের শাস্তির দাবি ওঠে সব মহলে। ঘটনার দুই দিনের মধ্যে মামলার প্রধান আসামি সৌদি প্রবাসী কামরুল ইসলাম পালিয়ে সৌদি আরবে চলে গেলেও হত্যার ভিডিও দেখে সৌদি প্রবাসীদের সহযোগিতায় তাকে আটক করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। রাজন হত্যার দেড় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ওই বছরের ১৬ই আগস্ট ১৩ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুরঞ্জিত তালুকদার। পরে মাত্র ১৭ কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে ২০১৫ সালের ৮ই নভে¤॥^র এ মামলায় রায় ঘোষণা করেন সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালত। রায়ে আসামিদের মধ্যে কামরুল ইসলাম, ময়না চৌকিদার, তাজউদ্দিন আহমদ বাদল ও জাকির হোসেন পাভেল আহমদকে মৃত্যুদ-ের আদেশ দেয়া হয়। এছাড়া রাজনকে নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া কামরুলের সহযোগী আসামি নূর মিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদ-, কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ও শামীম আহমদকে সাত বছর করে কারাদ- এবং দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীকে এক বছরের কারাদ- দেয়া হয়। পরে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি পাভেল আহমেদ ছাড়া মৃত্যুদ-প্রাপ্ত তিন আসামি আপিল ও জেল আপিল করেন। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত আসামি নূর মিয়াও সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন। গত ১২ই মার্চ ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষ হয়। হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জহিরুল হক জহির, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আতিকুল হক সেলিম ও নিজামুল হক নিজাম। আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন এস এম আবুল হোসেন, বেলায়েত হোসেন, মো. শাহরিয়ার ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী। আর পলাতক দুই আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাসনা বেগম শুনানি করেন।
