ছবির ক্যাপশন:
অসাধু ডাক্তার ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের যোগসাজসে বিক্রি হচ্ছে এসব মানহীন ওষুধ, নেই প্রশাসনের নজরদারি
প্রতিবেদক, মেহেরপুর:
মেহেরপুরে জেলাজুড়ে সয়লাব ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের ওষুধ। কিন্তু দেখার কেউ নেই। জীবন বাঁচাতে মানসম্মত ওষুধ উপেক্ষা করে মেহেরপুরের এক শ্রেণির অসাধু ডাক্তার ও ওষুধ ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার লোভে নকল-ভেজাল এবং নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনুমোদনহীন ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদিত মানহীন ওষুধ দেদারছে মেহেরপুরে বাজারজাত করছে। এসব ওষুধ ব্যবহারে মানুষ সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও জটিল রোগে আক্রা›ত হয়ে পড়ছে। পাচ্ছে না কাক্সিক্ষত সুফল। চিকিৎসক, ওষুধ বিক্রেতা ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের যোগসাজসে সহজেই নকল ভেজাল আর নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি ওষুধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় জেলাজুড়ে চলছে নিম্নমানের ওষুধ বাণিজ্য। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় চাকচিক্য মড়ক ব্যবহার করে সুনামধন্য কোম্পানির নামেও বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের এসব ওষুধ।
এবিষয়ে ওষুধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ড্রাগ সুপাররের তোষণ নীতি ও স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাবে এসব মানহীন ওষুধগুলো কিছু অসাধু ওষুধ কোম্পানি বাজারজাত করে আসছে। কিছু ফার্মেসিগুলো মেট্টানিডাজল-৫০০ মি.গ্রা প্রতি ট্যাবলেট অপারেশন রোগীদের জন্য মূল্য ১ টাকা ৩০ পয়সা, অথচ এই নামের নকল ওষুধ ২০ থেকে ২৫ পয়সার কিনে ২ থেকে ৩ টাকায় বিক্রয় করে থাকে। কিটোরোলাক ব্যথানাশক প্রতিটি ১০ মি.গ্রা ট্যাবলেটের সর্বোচ্চ মূল্য ১৫ টাকা, কিন্তু নকলগুলো একই রকম প্যাকেট নিম্নমানের ট্যাবলেটটি ১ টাকায় কিনে ১৫ টাকায় বিক্রয় করছে। কাটা-ছেড়া রোগীর সেলাইয়ের জন্য ক্যাটগাড মূল্য ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, অথচ সেখানে নকলটি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় কিনে আসলটির মূল্যে বিক্রয় করে থাকে। সেফট্রিকজন ইনজেকশন ১ গ্রাম ৬০ টাকায় কিনে ১৯০ টাকায় কেউ কেউ বিক্রয় করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রযুক্তির সহায়তায় দামি কোম্পানির নকল মোড়কে বিক্রি হচ্ছে ভিটামিন ভিট, বলারিস্ট, নিরাময়, ওসাকা ও বডি ফিল্টার। ফার্মেসির কিছু মালিক এগুলো মাত্র ৫০-৬০ টাকায় কিনে ২৫০- ৩০০ টাকায় বিক্রয় করে থাকে। হিস্টাট্যাব ১ বক্স’র মূল্য ১০০ টাকা। সেখানে নিম্নমানের ওষুধ ১ বক্স মাত্র ৩০ টাকা। এজিসথ্রোমাইসিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিটির বাজার মূল্য ৩৫-৫৫ টাকা, কিন্তু নকলটি ২ টাকায় ক্রয় করে ৩৫ টাকায় বিক্রয় করছে অনেকে। এমনকি শহরতলীর গ্রামগুলোর পান, বিড়ি, মুদি দোকানেও এসব নিম্নমানের ভেজাল এজিনথ্রোমাইসিন পাওয়া যায়। এভাবে নকল-ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোগী, লাভবান হচ্ছে ভুয়া কোম্পানি ও দোকানদার। রোগী ও তার স্বজনদের অজান্তেই অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে এ ভেজাল ওষুধের কারণে।
মেহেরপুর শহরের একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, অখ্যাত কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা ওষুধ বিক্রেতা ও ডাক্তারদের বিভিন্ন উপঢৌকন, নগদ টাকাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকেন। আর এসব কোম্পানির ওষুধ বিক্রি করে বিক্রেতারাও অধিক মুনফা অর্জন করছে।
হাসপাতাল গেটের ওষুধ ব্যবসায়ী আ. আজিজ বলেন, এ ভেজাল ওষুধ বিক্রয়ের প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ড্রাগ সুপারের উদাসিনতার কারণে মূলত বাজারে ভেজাল ওষুধ বিক্রি হচ্ছে।
মেহেরপুর ওষুধ বিক্রেতা সমিতির আহ্বায়ক আনারুল ইসলাম বলেন, ‘ড্রাগ সুপার আমাদের কাছে নিম্ন ও ভেজাল ওষুধ বিক্রেতাদের তালিকা চেয়েছেন। আমরা তালিকা তৈরি করছি, আমরা অচিরেই এসব ভেজাল বিক্রেদতাদের বিরুদ্ধে সমিতি থেকে ব্যবস্থা নেব।’
মেহেরপুর ফারিয়ার সভাপতি বলেন, মেহেরপুরে প্রায় অর্ধ শতাধিক কোম্পানি সরাসরি প্রতারণা করে ওষুধ বিক্রয় করছে। আর এ জন্য যে শুধু নিম্নমানের কোম্পানিগুলো দায়ী, তা কিন্তু নয়। এর সঙ্গে জড়িত সরাসরি প্রতিষ্ঠিত ডাক্তারগণও। ডাক্তাররা এসব কোম্পানির কাছে থেকে নগদ টাকাসহ বিভিন্ন উপঢৌকন নিয়ে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। যেহেতু ডাক্তারা ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন, তাই ওষুধ ব্যবসায়ীরাও এসব ওষুধ বিক্রয় করছেন। তিনি আরও বলেন, এসব কোম্পানির ওষুধ খেয়ে মানুষের শতকরা ২৫ ভাগও উপকার হচ্ছে না। আবার এমন অনেক কোম্পানি রয়েছে, যাদের একই ওষুধের একেক মোড়কের ব্যাচ নম্বর ও ডিএন নম্বর ভিন্ন। একটা কোম্পানির একটি প্রোডাক্টের ব্যাচ নম্বর ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ডিএন নম্বর ও ভিন্ন হয় না।
মেহেরপুর সিভিল সার্জন বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ মানুষের বিভিন্ন ক্ষতি করে থাকে, এমনকি তার জীবনও শেষ হয়ে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি সিভিল সার্জেনের মাধ্যমে জেলার ড্রাগ সুপার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আমি ড্রাগ সুপারের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলব।’
