ফিল্মি স্টাইলে ব্যাংকে ঢুকে ভরদুপরে প্রায় ৯ লাখ টাকা লুট!

আপলোড তারিখঃ 2020-11-16 ইং
ফিল্মি স্টাইলে ব্যাংকে ঢুকে ভরদুপরে প্রায় ৯ লাখ টাকা লুট! ছবির ক্যাপশন:
জীবননগরের উথলীতে সিসি ক্যামেরা ও দুর্বল নিরাপত্তার সুযোগে সোনালী ব্যাংকে পিপিই পরে তিন অস্ত্রধারীর হানা অতিরিক্ত ডিআইজি নাহিদুল ইসলাম ও সোনালী ব্যাংকের জিএম খোকন চন্দ্রসহ চুয়াডাঙ্গার ডিসি-এসপির ঘটনাস্থল পরিদর্শন জীবননগর অফিস/প্রতিবেদক, উথলী: ফিল্মি স্টাইলে হানা দিয়ে ব্যাংক থেকে ভরদুপুরে প্রায় ৯ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটেছে। হেলমেট ও পিপিই পরে গ্রাহক সেজে প্রথমে ব্যাংকে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। পরে দুর্বল নিরাপত্তার কারণে বিনা প্রতিরোধে লুটের টাকা নিয়ে চম্পট দেয় তিন অস্ত্রধারী। গতকাল রোববার দুপুরে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলীতে অবস্থিত সোনালী ব্যাংক শাখায় এই দুর্ধর্ষ ডাকাতি সংঘটিত হয়। দুর্বৃত্তরা ব্যাংকে প্রবেশ করেই অস্ত্রের মুখে প্রহরী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জিম্মি করে ক্যাশ কাউন্টার থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় কয়েকজন প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্বৃত্তরা তাদের অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে। ঘটনার খবর পেয়ে বিজিবির উথলী ক্যাম্পের সদস্যরা ও জীবননগর থানা-পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ততক্ষণে মোটরসাইকেলযোগে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়েন ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ উথলী বাজারে থাকা লোকজন। ডাকাতির খবর মুহূর্তে অত্র এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে ভিড় জমায়। এসময় ব্যাংকে নিরাপত্তায় থাকা প্রহরীরা কেন ডাকাতদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন না, তা নিয়েও অনেকে অনেক ধরণের মন্তব্য করেন। ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসক মো. নজরুল ইসলাম সরকার ও পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এর আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছান দামুড়হুদা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবু রাসেল। পরে সন্ধ্যায় খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম ও সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের জিএম খোকন চন্দ্র বিশ্বাস আকস্মিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। এসময় সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের জিএম ও পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ব্যাংকের এই শাখাটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন এবং কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা কর্মীদের কাছ থেকে পুরো ঘটনার বর্ণনা শোনেন। এদিকে, ডাকাতি ঘটনার পরে ব্যাংকের ওই শাখা থেকে খেলনা পিস্তলের একটি অংশ উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে দুর্বৃত্তরা হয়তো খেলনা পিস্তল দেখিয়ে টাকা লুট করে পালিয়ে যায়। এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। এ ঘটনার পর থেকে উথলী বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘটনার বর্ণনায় উথলী সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, ‘রোববার বেলা সোয়া একটার দিকে হেলমেট ও পিপিই পরে ব্যাংকের ভেতরে ঢোকেন তিনজন। প্রথমেই তাদের একজন এক প্রহরীর গলায় ধারালো চাকু ঠেকিয়ে ব্যাংকের দরজা বন্ধ করে দেয়। বাকি দুজন অস্ত্রের মুখে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রহরী ও গ্রাহকদের জিম্মি করে ব্যাংকের সকলের মোবাইল ফোনগুলো নিয়ে একটি ঘরে সবাইকে বন্দী করে ফেলেন। এসময় ক্যাশ কাউন্টারে থাকা ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯০০ টাকা লুটে নেয় তারা।’ ``এই ব্যাংক কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দুর্বৃত্তরা অস্ত্রের মুখে ব্যাংকের ভল্ট খুলে দিতে বাধ্য করেন। তবে ওই সময় টাকা তুলতে একজন গ্রাহক ব্যাংকে এসে অস্ত্রধারীদের দেখে ব্যাংক থেকে বের হয়ে যান। তিনি চিৎকার শুরু করেন। এসময় অস্ত্রধারীরা দ্রুত ব্যাংক থেকে বের হয়ে যান। তাই ভল্টের কোনো টাকা লুট হয়নি।’ ব্যাংকের প্রহরী আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ‘বেলা ১টা ১৫ মিনিটের দিকে মোটরসাইকেলে তিনজন ব্যাংকে ঢোকে। তাদের সবার মুখে মাস্ক ও মাথায় হেলমেট ছিল। ব্যাংকে ঢোকার দুই মিনিট পরই তারা পিস্তল বের করে ব্যাংকের ম্যানেজারসহ কর্মকর্তাদের জিম্মি করে। এরপর ক্যাশে থাকা টাকা লুট করে পালিয়ে যায়।’ ব্যাংকের একজন কর্মচারী বলেন, ‘দুপুর হওয়ায় ব্যাংক ও ব্যাংক এলাকার আশপাশেও লোকজনের উপস্থিতি কম ছিল। এসময় তিন ব্যক্তি হেলমেট পরে ব্যাংকে আসে। তারা ব্যাংকের গেটে এসেই অস্ত্রের মুখে ব্যাংকের দারোয়ানকে জিম্মি করে এবং তাঁকে ঠেলে ব্যাংকের ভেতরে ঢুকিয়ে ভেতর থেকে গেট বন্ধ করে দেয়। এরপর তারা ক্যাশ কাউন্টার ও ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে সবাইকে অস্ত্রের মুখে ওই কক্ষের একটি কোনায় নিয়ে যায়। সবার মোবাইল ফোনসেট নিয়ে নেয়। তারপর ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে প্রায় ৯ লাখ টাকা নিয়ে দ্রুত ব্যাংক থেকে বের হয়ে যে মোটরসাইকেলে তারা এসেছিল, সেই মোটরসাইকেলে চড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। উথলী গ্রামের এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ফোনে খবর পাই ব্যাংকে ডাকাতি হচ্ছে। এরপর আমিসহ কয়েকজন ব্যাংকে যাই। এর আগে বিজিবি ও পুলিশ সুপারকে খবর দিই।’ ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনিসহ উপস্থিত কয়েকজন ব্যবসায়ী দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলযোগে পালানোর সময় তাদেরকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেনও তাঁরা। তাদের ছোঁড়া ইটে এক ডাকাত সদস্য মাথায় আঘাত প্রাপ্তও হয়। এসময় ডাকাত দলের অন্য এক সদস্য পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করতে উদ্যত হলে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে তারা মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনজন ডাকাত মাথায় হেলমেট পরা অবস্থায় মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় আমরা তাদের ধাওয়া করি। কিন্তু তারা আমাদের গুলি করার হুমকি দিলে আমরা পিছু হটে যেতে বাধ্য হই। দুর্বৃত্তরা ডুমুরিয়া রাস্তা দিয়ে আন্দুলবাড়িয়ার দিকে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ‘এর আগেও ১৯৮৯ ও ২০০০ সালে এই ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। তবে ১৯৮৯ সালে ডাকাতরা কোনো টাকা-পয়সা লুট করতে না পারলেও ২০০০ সালে অনেক টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এই দুটি ঘটনায় ঘটেছিল রাতে। দিনদুপুরে ডাকাতির ঘটনা এই প্রথম। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অবহেলা আর উদাসীনতার কারণেই ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে স্থানীয়রা আরও জানান, যেখানে সারা দেশের প্রতিটি বেসরকারি ব্যাংকে নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে সোনালী ব্যাংকের এই শাখায় নিরাপত্তার জন্য আজও পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি। এমনকি নিরাপত্তায় থাকা তিনজন প্রহরীর কাছে বাঁশের লাঠি ছাড়া ডাকাতদের প্রতিরোধ করার মতো অস্ত্রও নেই। শুধু লাঠি দিয়ে অস্ত্রের মোকাবিলা করা যায়?।’ জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘দুর্বৃত্তরা ব্যাংকের পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারী, তিনজন প্রহরী ও দুজন গ্রাহককে খেলনা পিস্তল উঁচিয়ে ভয় দেখিয়ে দিনদুপুরে টাকা লুট করেছে। ব্যাংকটি নিরিবিলি এলাকায় অবস্থিত এবং প্রহরীরা নিরস্ত্র হওয়ায় দুর্বৃত্তরা দুপুরের খাওয়ার বিরতির সময়কে কাজে লাগিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা অপরাধীদের ধরতে সাড়াশি অভিযান অব্যাহত রেখেছি।’ জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম মুনিম লিংকন প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘অস্ত্রধারী তিনজন দুর্বৃত্ত একটি মোটরসাইকেলে করে উথলী যান। ব্যাংক লুট শেষে একই মোটরসাইকেলে করে আন্দুলবাড়িয়ার দিকে চলে যান।’ চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ নিরাপত্তার বেশ ঘাটতি ছিলো। যার ফলে এ ঘটনা ঘটেছে। ডাকাত দলের সদস্যদের গ্রেপ্তারসহ লুট হওয়া টাকা উদ্ধারে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। আশা করি খুব শিঘ্রই এ ঘটনার সাথে জড়িতদের আটক করা সম্ভব হবে।’ ``চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া বর্তমান সময়ে এ ঘটনা আসলে মেনে নেওয়ার মতো না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্বেও সেখানে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। বিষয়টি আসলে খুব দুঃখজনক। সোনালী ব্যাংক থেকে লুট হওয়া টাকা উদ্ধারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থা মাঠে কাজ করছে। আশা করি খুব শিঘ্রই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আটক করা সম্ভব হবে।’ গতকাল রোববার সন্ধ্যায় উথলী সোনালী ব্যাংক শাখা পরিদর্শন শেষে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘ব্যাংকের এই ঘটনা আসলেই খুব দুঃখজনক। ব্যাংকের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণেই এই ডাকাতির ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। সোনালী ব্যাংক থেকে লুট হওয়া টাকা উদ্ধারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে কাজ করছে। খুব শিঘ্রই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আটক করা সম্ভব হবে।’ অপরদিকে, উথলীর সোনালী ব্যাংক শাখায় দিনদুপুরে প্রায় ৯ লক্ষ টাকা লুটের খবর পেয়ে জীবননগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী হাফিজুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম মুনিম লিংকন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই)-এর উপপরিচালক মো. জিএম জামিল সিদ্দিক, সোনালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার খন্দকার আবুল কালাম আজাদ, সহকারী ব্যবস্থাপক আনিসুর রহমান, জীবননগর থানা-পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলামসহ ডিজিএফআই, ডিএসপি ও সিআইডির উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)