ছবির ক্যাপশন:

সমীকরণ ডেস্ক: নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগে রাষ্ট্রপতির গঠিত ছয় সদস্যের সার্চ কমিটির পাঁচজনই 'বিতর্কিত' উল্লেখ করে এই কমিটি নিরপেক্ষ নয় বলে দাবি করেছে বিএনপি। শুক্রবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে সার্চ কমিটি নিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগ করেন। নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, সার্চ কমিটিতে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছাপূরণে সহযোগিতায় পুরস্কৃত এবং আওয়ামী পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি একে শুধু বিতর্কিত করেনি- এর মাধ্যমে জনমতকে অগ্রাহ্য করার আরেকটি অগণতান্ত্রিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। এমন সব ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটিকে নির্দলীয় কিংবা নিরপেক্ষ বিবেচনা করার কোনোই অবকাশ নেই। একে স্বৈরাচারী আচরণ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি। এ রকম সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হবে না দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এমন একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ, সৎ, সাহসী ও যোগ্য ব্যক্তিগণ আগামী নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান কিংবা সদস্য হবেন- এমনটা আশা করাও বাতুলতা মাত্র। এই ঘটনার মাধ্যমে আগামী নির্বাচন প্রভাবিত করার সরকারি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে দেশবাসীকে হুশিয়ার হতে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করার জন্য দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতির গঠিত সার্চ কমিটি প্রত্যাখ্যান করছেন কিনা প্রশ্ন করা হলে মির্জা আলমগীর বলেন, এখানে প্রত্যাখ্যান করা বা না করার কোনো বিষয় নেই। নির্বাচন কমিশন যখন গঠিত হবে, তখন এই প্রশ্ন আসতে পারে। সার্চ কমিটির বিষয়ে বিএনপির প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সার্চ কমিটির প্রধান হিসেবে আপিল বিভাগের যে মাননীয় বিচারপতিকে নিয়োগ করা হয়েছে, তিনি ২০১২ সালের গঠিত সার্চ কমিটিরও প্রধান ছিলেন। যে কমিটির প্রস্তাবক্রমে রকিবউদ্দীন কমিশনের মতো একটি অযোগ্য, অনুগত, মেরুদ-হীন ও বিতর্কিত কমিশন নিযুক্ত হয়, সেই কমিটির প্রধানকেই নতুন সার্চ কমিটির প্রধান করার অর্থ হলো সরকার রকিবউদ্দীন কমিশনের মতোই আরেকটা অনুগত ও অযোগ্য নির্বাচন কমিশন নিয়োগ করতে চায়। কমিটির পাঁচ সদস্যের মধ্যে চারজনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কমিটির অন্যতম সদস্য যিনি হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি তিনি ছাত্রলীগের একজন সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবী হিসেবে বহুল পরিচিত ছিলেন। তার পিতা ডা. আখলাকুল হোসাইন ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা এবং নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার ছোট ভাই এখন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন। অপর সদস্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি মহাবিতর্কিত নির্বাচনের সময়ে তিনি নির্বাচন কমিশনের সচিব ছিলেন। নানা অনিয়মে ভরা ওই নির্বাচন নিয়মসিদ্ধ করার পুরস্কার হিসেবে অবসর গ্রহণের পর তাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় চুক্তি ভিত্তিতে পিএসসি'র চেয়ারম্যান করা হয়েছে। অনুগ্রহভাজন এবং সহকর্মীদের কাছে আওয়ামী ঘরানার সক্রিয় সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই আমলা সরকারের ইচ্ছাপূরণে সচেষ্টা থাকবেনথ এটাই স্বাভাবিক। সার্চ কমিটির নারী সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভিসি অধ্যাপক শিরীন আখতারও নিরপেক্ষ নন দাবি করে ফখরুল বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষক হিসেবে ২০১৪ সালের শিক্ষক সমিতির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তার পিতা মরহুম আফসার কামাল চৌধুরী কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি নিজেও কক্সবাজার মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী ছিলেন। কাজেই কোনো বিবেচনায় তাকে নিরপেক্ষ বলা যায় না। সার্চ কমিটির অপর সদস্য বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক যিনি রাজনৈতিক সরকারেরর অধীনস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে তিনি সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা রাখেন না। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সরকারের ইচ্ছাপূরণে তিনিও কোনো বাধা নন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দেননি ফখরুল। নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণে গত ১৮ নভেম্বর খালেদা জিয়ার দেয়া প্রস্তাবাবলির প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশনেত্রীর মূল কথাই ছিলথ অবসরপ্রাপ্ত একজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, অবসরপ্রাপ্ত একজন সচিব, অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষাবিদ কিংবা দলনিরপেক্ষ একজন বিশিষ্ট নাগরিক এবং একজন জ্যেষ্ঠ নারীর সমন্বয়ে সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে। বলা হয়েছিল, বিচারপতি, সচিব, শিক্ষাবিদদের কেউ অবসর গ্রহণের পর কোনো লাভজনক পদে নিযুক্ত হয়ে থাকলে তিনি কমিটির সদস্য হতে পারবেন না। প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল যে, সার্চ কমিচির কোনো সদস্য সরকারের অধীনস্থ হবেন না, দায়বদ্ধ থাকবেন না, অনুগ্রহভাজন হপ্রণ না এবং স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। নিরপেক্ষতার জন্য এসব প্রস্তাব দেয়া হলেও বিএনপির প্রস্তাব অগ্রাহ্য করা হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, যাদের সার্চ কমিটির সদস্য নিযুক্ত করা হয়েছে, এদের দ্বারা কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন হবেথ এটা কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। গতবারও একই রকম দেখা গেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যের বিষয়ে মির্জা আলমগীর বলেন, অপেক্ষা করার মতো কথাবার্তা বলে তারা বিএনপিকে ভুল পথে পরিচালিত করতে চান। কিন্তু তা হচ্ছে না। এই সার্চ কমিটি কোনোদিনই নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারবে না। সার্চ কমিটি পুনর্গঠনের কোনো আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে করবেন কিনা প্রশ্ন করা হলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, না কোনো আবেদন করা হবে না। জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি বলেছেন যে, তারা সুষ্ঠু নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটা সমঝোতার উদ্যোগ নিতে চেয়েছিল। যদিও এখন সুযোগ নেইথ এই ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, বিএনপি জাতিসংঘের সবসময়েই যেকোনো উদ্যাগকে সমর্থন করেছে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, জাতিসংঘ যে উদ্যোগ নেয়, এই সরকার তার আশপাশ দিয়েও যায় না। তাদেরকে সেই উদ্যাগ গ্রহণ করতেও বাধা প্রদান করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর তৎকালীন জাতিসংঘের বিশেষ দূত অস্কার ফান্র্দেজ তারাংকো বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় আসতে চেয়েছিলেন, তাকে আসতে দেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
