ছবির ক্যাপশন:

সমীকরণ ডেস্ক: টঙ্গীর তুরাগ তীরে আজ থেকে ৫২তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশ-বিদেশি লাখো মুসল্লির ভিড়ে গোটা এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। এরপরও হেঁটে ও বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে দলে দলে মানুষ এ বৃহৎ ধর্মীয় জমায়াতে যোগ দিচ্ছেন।এদিকে ইজতেমা ময়দানে জঙ্গিসহ কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যাতে কোনো ধরনের নাশকতা চালাতে না পারে এ জন্য র্যাব ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনী গোটা এলাকায় ৫ স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি সব ধরনের সেবা কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন স্থানের তাবলিগ জামাতের সদস্য, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিল্পকারখানার মালিক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বিশ্ব ইজতেমার মাঠে বিভিন্ন ধরনের সেবা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। এরই মধ্যে তারা এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি শেষ করেছেন। ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের জন্য টঙ্গীর তুরাগ তীরে ১৬০ একর খোলা জমিনের ওপর চট দিয়ে মুসল্লিরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সুবিশাল সামিয়ানা তৈরি করেছেন। তাবলিগ জামাতের এ মিলনমেলায় বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে ৩০-৩৫ হাজার বিদেশি মেহমানসহ প্রায় ২০-২৫ লাখ মুসল্লির সমাবেশ ঘটবে বলে আয়োজক কমিটির মুরব্বিরা আশা করছেন। ইজতেমা মাঠের মুরব্বি গিয়াস উদ্দিন জানান, বিদেশি মুসল্লিদের জন্য এবার ২০ শতাংশ আবাসনসহ অন্যান্য ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। কোনো সভাপতিত্বহীন বিশ্ব ইজতেমার সব কাজ করা হয় মোশাওয়ারার (পরামর্শ) মাধ্যমে। প্রতিদিনই তাদের কাজ-কর্মের পরামর্শ হয় এবং দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়। সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তাদের নিজস্ব লোকজনও পুরো ময়দান এলাকায় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে মোতায়েন রয়েছেন। ইজতেমা ময়দানে এক মুসল্লির মৃত্যু : বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে আসা এক মুসল্লী বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। নিহত মো. ফজলুল হক (৫৬) ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মারুয়া গ্রামের মৃত আহম্মদ আলীর ছেলে। তিনি বুধবার বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আসেন। ইজতেমার মুরব্বি মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, ইজতেমার ১০ খিত্তায় অবস্থানকারী ওই মুসল্লি সকালে পানি আনতে খিত্তার বাইরে যান। পানি নিয়ে খিত্তায় ফিরে আসার পর তিনি অসুস্থবোধ করেন। পরে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে নেয়া হলে পথে তিনি মারা যান। বাদ জোহর ইজতেমা ময়দানে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তার লাশ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা : গাজীপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানান, বিশ্ব ইজতেমায় প্রথম পর্বে র্যাব-আনসার সদস্য ছাড়াও পোশাকে-সাদা পোশাকে প্রায় ৬ হাজার নিরাপত্তাকর্মীরা পাঁচটি সেক্টরে ভাগ হয়ে কাজ করছেন। এখানে জলে-স্থলে ও আকাশসীমাও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে স্থ্পান করা হয়েছে পুলিশের কন্ট্রোল রুম। বিশ্ব ইজতেমা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থান, তুরাগ নদী, মাঠের চারপাশ ও ওয়াচ টাওয়ারে পোশাকে-সাদা পোশাকে পুলিশ এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স কাজ করছে। বাইনোকুলার, মেটাল ডিটেক্টর ও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা মনিটরিং করা হচ্ছে। মিডিয়া সেন্টার স্থাপন: শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে পুলিশ কন্ট্রোলরুমের পাশে সংবাদকর্মীদের জন্য মিডিয়া সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। জেলা পুলিশ বিভাগ সেখানে সংবাদকর্মীদের জন্য তথ্য প্রেরণে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। তোরণ নির্মাণ: বিশ্ব ইজতেমায় আগত দেশি-বিদেশি মুসল্লিদের স্বাগত জানিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন দশটি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। টঙ্গী ব্রিজের দক্ষিণপাশে, কামারপাড়া ব্রিজের পশ্চিম পাশে, হোন্ডা ফ্যাক্টরির রোডের মাথায়, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামের সামনে টেশিস মাঠের উত্তর পাশসহ ইজতেমা মাঠের প্রবেশ পথগুলোর মাথায় এ তোরণগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ার : বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক নিরাপত্তা মনিটরিং করার জন্য ইজতেমা ময়দান এলাকায় ১৪টি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে র্যাবের ৯টি এবং পুলিশের ৫টি ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। এসব ওয়াচ টাওয়ার থেকে সার্বক্ষণিক বাইনোকুলারের মাধ্যমে ইজতেমাস্থল পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে কন্ট্রোলরুম থেকে ময়দানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ড করা হচ্ছে। এছাড়া ইজতেমা চলাকালে র্যাবের হেলিকপ্টার গোটা এলাকার আকাশে টহল দেবে। ভাসমান সেতু: বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের পারাপারের জন্য তুরাগ নদীর ওপর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এবার ৭টি ভাসমান সেতু স্থাপন করা হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা: বিশ্ব ইজতেমায় আগত দেশি-বিদেশি মুসল্লিদের খাওয়া, অজু, গোসল, পয়ঃনিষ্কাষণ ইত্যাদির জন্য ইজতেমা মাঠে স্থাপিত ১২টি নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন ঘণ্টায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ গ্যালন বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মশা নিধন: গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ জানান, বিশ্ব ইজতেমাস্থলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মশা নিধনের পদক্ষেপ নিয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। ইজতেমা কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী ইতোমধ্যে একশ ড্রাম বিস্নচিং পাউডার সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইজতেমা চলাকালীন ২৫টি গার্বেজ ট্রাকের মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণ করা হবে। ২৪টি ফগার মেশিনে মাধ্যমে ইজতেমা মাঠ এলাকায় মশক নিধনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইজতেমা মাঠের চারপাশে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো হবে। স্বাস্থ্যসেবা : গাজীপুর সিভিল সার্জন আলী হায়দার খান জানান, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে টঙ্গীর ৫০ শয্যা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ বিছানা বাড়ানো হয়েছে। গাজীপুর ও ঢাকা জেলা সিভিল সার্ভিসের পক্ষ থেকে মুসল্লিদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার জন্য টঙ্গীর মন্নুনগর, বাটা গেট, আশরাফ মিলস গেটসহ ইজতেমাস্থলের আশপাশে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগেও ওইসব এলাকায় বেশ কিছু ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। রোগীদের আনা-নেয়ার জন্য বিদেশি ক্যাম্পে ও টঙ্গী হাসপাতাল চত্বরে সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন থাকবে। বিশেষ ট্রেন ও বাস সার্ভিস: ইজতেমা ময়দানে মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বৃহস্পতিবার থেকে বিআরটিসির শতাধিক স্পেশাল বাস সার্ভিস চলাচল করছে। বিআরটিসির সূত্র জানায়, আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল ভায়া ইজতেমাস্থল, শিববাড়ী-মতিঝিল ভায়া ইজতেমাস্থল, টঙ্গী-মতিঝিল ভায়া ইজতেমাস্থল, গাজীপুর-চৌরাস্তা, মতিঝিল-ভায়া ইজতেমাস্থল, গাবতলী-গাজীপুর ভায়া ইজতেমাস্থল, গাবতলী-মহাখালী ভায়া ইজতেমাস্থল, গাজীপুর-মতিঝিল ভায়া ইজতেমাস্থল, মতিঝিল-বাইপাল ভায়া ইজতেমাস্থল বিআরটিসির বাস সার্ভিস চলাচল করছে। এদিকে বিশ্ব ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের যাতায়াতে সুবিধার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিশেষ ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা করবে। এ ছাড়াও সকল আন্তঃনগর, মেইল এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, দুই ধাপের ইজতেমার প্রথম ধাপের শুরুর দিন ঢাকা-টঙ্গী-ঢাকা দুটি জুমা স্পেশাল, আখেরি মোনাজাতের আগের দু'দিন জামালপুর ও আখাউড়া থেকে দুটি করে চারটি অতিরিক্ত ট্রেন পরিচালনা করা হবে। র্যাব-পুলিশের সংবাদ সম্মেলন: র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমদ বলেছেন, জুলাই মাসে শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর দেশে কোনো জঙ্গি হামলা হয়নি। আর কোনো জঙ্গি হামলা যাতে না হতে পারে সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। ইজতেমা চলাকালে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ইজতেমা ময়দানকে দুটি সেক্টরে ভাগ করে জল, স্থল ও আকাশ পথে ত্রিমাত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তিনি বিকালে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমাস্থলের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিংকালে ওইসব কথা বলেন। এ সময় র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আনোয়ার লতিফ, র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মো. মুফতি মাহমুদ, কমান্ডিং অফিসার তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ, কোম্পানি কোমান্ডার মোহাম্মদ মহিউল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে টঙ্গীর টেলিফোন শিল্পসংস্থার (টেশিস) মাঠে গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানান, বৃহস্পতিবার থেকে ইজতেমার চারপাশে ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। তারা পাঁচ স্তরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এবারই প্রথম বিশ্ব ইজতেমার চারপাশ সিসি টিভির আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া মোড়ে-মোড়ে, গলিতে-গলিতে পুলিশ সন্দেহভাজনদের তল্লাশি চালাচ্ছে। ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প উদ্বোধন : বৃহস্পতিবার দুপুরে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার মুসল্লিদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে হামদর্দ ল্যাবরেটরিজের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প উদ্বোধন করেন। এ সময় স্থানীয় সাংসদ জাহিদ আহসান রাসেল, হামদর্দের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাকীম মো. ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। টঙ্গীর মন্নুনগর এলাকায় গাজীপুর সিভিল সার্জন, র্যাবের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, হামদর্দ ইবনে সিনা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন হোমিওপ্যাথিক অনুশীলন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করেছে। তিন দিনব্যাপী এ বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব আগামী ১৫ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। চার দিন বিরতি দিয়ে ২০ জানুয়ারি শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব এবং ২২ জানুয়ারি আখেরি মেনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা। মুরব্বি গিয়াস উদ্দিন আরও বলেন, বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেয়া মুসল্লিদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ২০১১ সাল থেকে দেশের ৬৪ জেলার মুসল্লিদের জন্য দুই দফায় বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয়। ইতোপূর্বে ৬৪ জেলার মুসল্লিদের জন্য তিনদিনের এক দফায় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে ক্রমবর্ধমান মুসল্লিদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২০১৫ সাল থেকে দেশের ৩২টি জেলার মুসল্লিদের জন্য দুই দফায় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এতে এক বছর পর পর ৩২ জেলার মুসল্লিরা ইজতেমায় অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অর্থাৎ গত বছর যেসব জেলার মুসল্লিরা দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিয়েছিলেন, ওই সব জেলার মুসল্লিরা এ বছর ইজতেমায় অংশ নিতে পারবেন না। তারা এবার নিজ জেলায় আঞ্চলিক ইজতেমায় অংশ নেবেন। ২০১৫ সাল থেকে এ আঞ্চলিক ইজতেমা শুরু হয়েছে।
